প্রথমে চারা তৈরি করতে হবে। চারা তৈরি করার জন্য কি কি করবেন চলুন জেনে নিইঃ
প্রথমে জমি নির্বাচন করুন যেখানে চারা তৈরি করবেন। জমিটি অবশ্যই ঢালু হতে হবে যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে না, বৃষ্টি বা সেচ দিলে পানি গড়িয়ে চলে যাবে। নাসিক পেঁয়াজ চাষের জন্য বেলে দোয়াস, পলি দোয়াস ইত্যাদি মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী। ১ কেজি পেঁয়াজের দানাতে চারা তৈরির জন্য ৪ শতক জমির প্রয়োজন। বেশি নিলে আরও ভাল হয়।
এখন জেনে নিই কিভাবে চারা জন্য জমি প্রস্তুত করবেনঃ
প্রথমে আপনি ৩৩ শতক জমিতে ৫-৬ কেজি ইউরিয়া সার ছিটিয়ে সেচ দিবেন। এর ফলে জমিতে লুকিয়ে থাকা আগাছা মাটি থেকে উপরে বের হয়ে আসবে। এরপর আপনি জাহামা দিয়ে আগাছা পুড়িয়ে বা পচিয়ে ফেলবেন। তারপর
জমি খুব ভাল করে ২-৩ টি চাষ দিয়ে মাটি ছোট ছোট ঝুর ঝুরে করে সমান করে নিন। শেষ চাষে আপনি ৪ শতক জমির জন্য ২ কেজি টি এস পি, ১ কেজি ৫০০ গ্রাম এম ও পি (পটাশ), ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া, নাইট্রো ৫০০ml, ২০০ গ্রাম কার্বোটাফ ৫ জি, ৫০০ গ্রাম রুটোন এবং ৬০ গ্রাম বোরন মিশিয়ে মাটি প্রস্তুত করে নিন। মাটির গুনাগুন ভেদে সারের পরিমাণ কম বেশি হতে পারে।
বেডের মাফ প্রস্থ ৩ হাত এবং দৈর্ঘ্য ৪০- ৫০ হাত দিবেন। ২ বেডের মাঝখানে ১ ফুট ফাঁকা রাখতে হবে। এই ফাঁকা জায়গাতে আপনি চলাচল করতে পারবেন এবং সেচ দিতে পারবেন। বেড অবশ্যই কিছুতা ঢালু করতে হবে। যাহাতে বৃষ্টির পানি বা সেচের পানি জমে না থাকে।
এখন নাসিক পেঁয়াজের বীজ বা দানা ছিটানোর সময়ঃ
পেঁয়াজের দানা ২ টি পদ্ধতিতে ছিটানো যায়।
১) শুকনা পেঁয়াজের দানা বেডের শুকনা মাটিতে ছিটিয়ে দেওয়া। এরপর পর ঝরনা দিয়ে বেডের উপর বা বেডের মাঝখানে নালাতে ধালাও ভাবে সেচ দিতে হবে
২) শুকনা পেঁয়াজের দানা ১২ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। তারপর পানি ঝরিয়ে নিতে হয়। এরপর বেডের শুকনা মাটিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। এরপর পর ঝরনা দিয়ে বেডের উপর সেচ দিতে হবে।
পেঁয়াজের দানা ছিটানোর আগে শোধন করে নিতে পারেন । ১ কেজি নাসিক পেঁয়াজের দানার সাথে ৩৫ গ্রাম মেনসার ( মেঙ্কোজেব ও কারবেন্ডাজিম) ভাল করে মিশাতে হবে এবং হালকা পানি দিয়ে ভাল করে মাখিয়ে নিন। তারপর পেঁয়াজের দানা কিছুক্ষুন রেখে দিয়ে ঝর ঝরে করে নিতে হবে। মেনসার দিলে বর্ষার পানি বীজ সহজে নষ্ট করতে পারে না।
যদি ঝরনা দিয়ে সেচ দিতে চান তাহলে পেঁয়াজের দানা ছিটানোর পর বেডের উপর খড় বা বিচালি বিছিয়ে দিয়ে পারেন।
এখন পেঁয়াজের দানাগুলো বা চারা গুলো কে রোদ ও বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে হবেঃ
v রোদ ও বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য পলিথিন বা নেট দিয়ে চাউনি দিতে হবে।
v যদি ২-৩ ফুট উঁচু করে পলিথিন বা নেট দিয়ে ছাউনি তৈরি করেন তাহলে চারা ছোট থাকা অবস্থায় যখন বৃষ্টি হবে না তখন আপনি পলিথিন বা নেট সরিয়ে বা আগলা করে রাখবেন। যদি হঠাত প্রচুর রোদ শুরু হয় তাহলে সকাল ১০ থেকে বিকাল ৪ পর্যন্ত পলথিন বা নেট ছাউনি দিয়ে রাখবেন। বাকি সময়টি আপনাকে খুলে রাখতে হবে।
v তবে নেট বা পলিথিন দিয়ে ১০-১২ ফুট উঁচু করে ঘর তৈরি করে ছাউনি করতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়।
v সব চেয়ে ভাল হবে যদি ৫-৬ ফুট উঁচু করে ২ চালা করে সবুজ নেট দিতে পারেন।
পেঁয়াজের চারা যত্নঃ
দানা বেডে ছিটানোর পর ১০ থেকে ১৫ দিন পর আগাছানাশক স্প্রে করতে হবে। আগাছানাশক হিসাবে এক্টিভার, অক্সিফ্লোর, অক্সি গোল্ড, হুইপ সুপার, সনেট, টাইজালো সুপার ইত্যাদি বাজারে পাওয়া যায়। আগাছা অনুযায়ী স্প্রে করতে হবে।
স্প্রে করার ৫-৬ দিন পর চিলেটেড, রিডোমিল গোল্ড, এবং যেকোন কীটনাশক একসাথে মিশিয়ে স্প্রে করবেন। চারার বয়স ২১ দিন হলে ১ম সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ১৩ কেজি, দস্তা ৪ কেজি, ডি এ পি ২০ কেজি দিতে হবে।
চারার বয়স যখন ৩০ দিন হবে তখন ২য় সার প্রয়োগ করতে হবে। টি এস পি ২০ কেজি, ইউরিয়া ২০ কেজি, ম্যাগমা প্লাস ৪ কেজি দিতে হবে।
চারার বয়স যখন ৪০ দিন হবে তখন চারা মোটা করার জন্য ইউরিয়া ২০ কেজি, দস্তা ৫ কেজি সার দিতে হবে। ফলে চারা মোটা হতে শুরু করবে।
চারার বয়স যখন ৪৫-৫০ দিন বয়স হবে ঠিক তখন আবহাওয়া বুঝে যাহাতে লাগানোর ৭ দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল করে অন্য জমিতে রোপণ করে দিবেন।
চারা রোপণ পদ্ধতিঃ
জমি তৈরিঃ
প্রথমে আপনি জমিতে বিঘা প্রতি বা ৩৩ শতক জমিতে ৫-৬ কেজি ইউরিয়া সার ছিটিয়ে সেচ দিবেন। এর ফলে জমিতে লুকিয়ে থাকা আগাছা মাটি থেকে উপরে বের হয়ে আসবে। এরপর আপনি জাহামা দিয়ে আগাছা পুড়িয়ে বা পচিয়ে ফেলবেন।
আগাছা দমন হলে ট্রাক্টর দিয়ে ৩টি চাষ দিতে হবে। মাটি ছোট ছোট ঝুর ঝুরে করে নিতে হবে। জমি যেন পরিস্কার পরিছন্ন হয়। জমির শেষ চাষে বিঘা প্রতি টি এস পি ২৫কেজি, পটাশ ১৫ কেজি, দস্তা ২ কেজি ইত্যাদি সার এবং মাটি শোধন বিষ অথবা ফোরাডান ২ কেজি দিতে হবে এবং মই দিয়ে জমি সমান করে মাটি প্রস্তুত করে নিতে হয়। রুটার দিয়ে চাষ দিলে মই দেওয়া লাগবে না।
চারা রোপণঃ
চারা রোপণের ১ দিন আগে জমি ভিজিয়ে নিতে হবে। পরের দিন অথবা চারা রোপণের দিন ৩৩ শতক জমিতে ১৫ কেজি ডি এ পি, ১০ কেজি ইউরিয়া সার এবং ঘাস রোধক বিষ পেন্ডামিথালিন গ্রুপের পানিডা/ ক্রিজেন্ডা ৩ বোতল বা ৩০০ গ্রাম একসাথে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। অথবা চারা লাগানোর পরে পেন্ডামিথালিন গ্রুপের পানিডা স্প্রে করেও দিতে পারেন।
যদি চাষ দেওয়া শুকনা মাটিতে চারা রোপণ করে সেচ দিলেও হবে।
এখন কৃষক দিয়ে ৫-৬ ইঞ্চি স্কয়ার দূরত্ব বজায় রেখে পেঁয়াজের চারা রোপণ করে দিতে হবে।
এর পর মাটি একটু শুকালে ৫-৭ দিন পর ৪৮ লিটার পানিতে ১৫০ গ্রাম ইপ্রোড্রিয়ন গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন রোভরাল, সেভরাল, মেমোরাল ইত্যাদি যেকোন একটি ছত্রাকনাশক , এমামেক্টিন গ্রুপের ফ্রিজ, কাপলান, সুলতান ইত্যাদি যেকোন একটি কীটনাশক স্প্রে করে দিতে হবে। ১০-১৫ দিন পর যখন মাটি শুকিয়ে যাবে তখন ২য় সেচ দিতে হবে।
২য় সেচে সার প্রয়োগঃ
এই সেচে ৩৩ শতক জমিতে ড্যাপ ৩০ কেজি, ইউরিয়া ২০ কেজি, ইত্যাদি সার এবং ঘাস রোধক বিষ পেন্ডামিথালিন গ্রুপের পানিডা/ ক্রিজেন্ডা ৩ বোতল বা ৩০০ গ্রাম একসাথে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
মাটি যো হলে ৫-৭ দিন পর খুচিয়ে/ নিড়িন/ কুপিয়ে দিতে হবে। নিড়ানির পর যেমন রোভরাল, সেভরাল, মেমোরাল ইত্যাদি যেকোন একটি ছত্রাকনাশক , এমামেক্টিন গ্রুপের ফ্রিজ, কাপলান, সুলতান ইত্যাদি যেকোন একটি কীটনাশক স্প্রে করে দিতে হবে। যাহাতে পেঁয়াজের পাতা সতেজ থাকে।
পেঁয়াজ গাছের বয়স ৩০-৩৫ দিন হলে আবারও সেচ দিতে হবে। ৩য় সেচে সার প্রয়োগঃ
৩৩ শতক জমিতে টি এস পি ৫০ কেজি, ইউরিয়া ২০ কেজি, ম্যাগমা প্লাস বা দস্তা ৪ কেজি, থিয়োভিট ২ কেজি, ইত্যাদি সার এবং ঘাস রোধক বিষ পেন্ডামিথালিন গ্রুপের পানিডা/ ক্রিজেন্ডা ৩ বোতল বা ৩০০ গ্রাম একসাথে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
এর পর মাটি হালকা শুকানোর পর খুচিয়ে/ নিড়িন/ কুপিয়ে দিতে হবে। এর পর পেঁয়াজের গাছের অবস্থা অনুযায়ী কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। যাহাতে পেঁয়াজের পাতা সতেজ থাকে।
পেঁয়াজ গাছের বয়স যখন ৫০-৫৫ দিন হবে তখন আবারও জমিতে সার প্রয়োগ করতে হবে।
৪র্থ সেচে সার প্রয়োগঃ
৩৩ শতক জমিতে ইউরিয়া ৩০ কেজি, সালফেট ১০ কেজি, দস্তা ১০ কেজি, পটাশ ২৫ সার এবং ঘাস রোধক বিষ পেন্ডামিথালিন গ্রুপের পানিডা/ ক্রিজেন্ডা ৩ বোতল বা ৩০০ গ্রাম একসাথে মিশিয়ে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
এর পর পেঁয়াজের বয়স ৯০-১০০ দিন বয়স হলে বিক্রয়ের উপযুক্ত হবে।
এই নাসিক পেঁয়াজ ১ মাস সংরক্ষন করে রেখে দেওয়া যায়।
বিশেষ কথাঃ মাটি অনুযায়ী সার ও সেচ কম বেশি হতে পারে। পেঁয়াজের গাছের কন্ডিশন অনুযায়ী সপ্তাহে একবার অথবা দুইবার কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। যাহাতে পেঁয়াজের পাতা সতেজ থাকে।